নাথান লায়ন টপকালেন অ্যাডিলেড টেস্টে গ্লেন ম্যাকগ্রাকে ছাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হলেন নাথান লায়ন। ৫৬৪ উইকেট নিয়ে তার সামনে এখন কেবল কিংবদন্তি শেন ওয়ার্ন। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন অস্ট্রেলীয় অফ-স্পিনার নাথান লায়ন। কিংবদন্তি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রাকে টপকে তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বোলার। প্রথম ওভারেই জোড়া উইকেট নিয়ে লায়ন তার উইকেট সংখ্যা ৫৬৪-এ উন্নীত করেছেন, যার ফলে তার সামনে এখন কেবল রয়েছেন ৭০৮ উইকেট শিকারী কিংবদন্তি শেন ওয়ার্ন।
নাথান লায়ন কীভাবে গ্লেন ম্যাকগ্রার ঐতিহাসিক রেকর্ড ভাঙলেন?
অ্যাডিলেড টেস্টের দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক প্যাট কামিন্স যখন দশম ওভারে বল তুলে দেন নাথান লায়নের হাতে, তখন ইতিহাস গড়ার জন্য তার প্রয়োজন ছিল মাত্র ২ উইকেট। লায়ন তার প্রথম ওভারেই ইংরেজ ব্যাটার অলি পোপকে মিডউইকেটে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন, যার মাধ্যমে তিনি ম্যাকগ্রার ৫৬৩ উইকেটের রেকর্ডে ভাগ বসান। ঠিক তার পরের কিছু মুহূর্তের মধ্যেই একটি দুর্দান্ত অফ-স্পিন ডেলিভারিতে বেন ডাকেটকে ক্লিন বোল্ড করে তিনি রেকর্ডটি নিজের করে নেন। ১৪০টি টেস্ট ম্যাচে ২৪৩ ইনিংস বল করে লায়ন এই উচ্চতায় পৌঁছান, যা তাকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ফিঙ্গার স্পিনারের মর্যাদায় আসীন করেছে।
এই অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ গত পাঁচ মাস ধরে লায়ন ৫৬২ উইকেটে থমকে ছিলেন। ব্রিসবেন টেস্টে বাদ পড়া এবং পার্থে মাত্র দুই ওভার বল করার সুযোগ পাওয়ার পর তার সামর্থ্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, অ্যাডিলেডের পারফরম্যান্স তার মোক্ষম জবাব। গ্লেন ম্যাকগ্রা নিজে একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য, এবং লায়ন যেভাবে গত এক দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সে এই সম্মানের যোগ্য।” লায়নের এই উত্থান মূলত তার ধৈর্যের ফল, কারণ একজন অফ-স্পিনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেটে উইকেট নেওয়া সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং ছিল।
অ্যাডিলেড টেস্টে লায়নের বোলিং কৌশল কতটা কার্যকর ছিল?
অ্যাডিলেডের পিচে বল হাতে নিয়ে লায়ন প্রথম থেকেই ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। বিশেষ করে বেন ডাকেটকে আউট করার ডেলিভারিটি ছিল একজন ধ্রুপদী অফ-স্পিনারের নিখুঁত নিদর্শন। বলটি সঠিক লেংথে পড়ে অফ-স্টাম্পের দিকে টার্ন করে এবং ব্যাটারকে ফ্রন্ট ফুটে রক্ষণাত্মক খেলতে বাধ্য করার পর স্টাম্পের মাথায় আঘাত করে। লায়নের এই ফ্লাইট এবং লুপ দেওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্য স্পিনারদের থেকে আলাদা করে তুলেছে, যা অ্যাডিলেডের উইকেটে অতিরিক্ত বাউন্স তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এর ফলে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই ম্যাচে লায়নের প্রত্যাবর্তনে অস্ট্রেলীয় বোলিং ইউনিটে ভারসাম্য ফিরে এসেছে। প্যাট কামিন্স এবং মিচেল স্টার্কের গতিশীল আক্রমণের সাথে লায়নের স্পিন ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের জন্য একটি ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লায়ন এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারে ২৪ বার পাঁচ উইকেট এবং ৫ বার দশ উইকেট শিকার করেছেন। রয়টার্স (Reuters) এর স্পোর্টস অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, লায়নের বর্তমান ফর্ম এবং ফিটনেস বজায় থাকলে তিনি ২০২৭ সালের অ্যাশেজ পর্যন্ত খেলবেন, যা তাকে শেন ওয়ার্নের রেকর্ডের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে। অ্যাডিলেডের এই স্পেলটি প্রমাণ করেছে যে কেন তাকে ‘গোট’ (GOAT – Greatest of All Time) বলা হয়।
এক নজরে: অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ পাঁচ টেস্ট উইকেট শিকারী
| বোলারের নাম | উইকেটের সংখ্যা | ম্যাচের সংখ্যা | গড় (Approx) |
| শেন ওয়ার্ন | ৭০৮ | ১৪৫ | ২৫.৪১ |
| নাথান লায়ন | ৫৬৪* | ১৪০ | ৩১.০৫ |
| গ্লেন ম্যাকগ্রা | ৫৬৩ | ১২৪ | ২১.৬৪ |
| মিচেল স্টার্ক | ৪২০* | ৯০+ | ২৭.৮০ |
| ডেনিস লিলি | ৩৫৫ | ৭০ | ২৩.৯২ |
নাথান লায়নের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ কী?
নাথান লায়নের পরবর্তী লক্ষ্য এখন স্পষ্টতই শেন ওয়ার্নের ৭০৮ উইকেটের মাইলফলক। তবে ৩৮ বছর বয়সে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া শারীরিক এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। যদিও লায়ন ঘোষণা করেছেন যে তিনি ২০২৭ সালের অ্যাশেজ পর্যন্ত খেলতে চান, তবে বয়স এবং ফর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার পেস-বান্ধব কন্ডিশনে স্পিনারদের দীর্ঘ সময় ধরে দলে জায়গা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, যা আমরা ব্রিসবেন টেস্টে দেখেছি যখন টিম ম্যানেজমেন্ট কেবল পেসারদের নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian) এর ক্রিকেট কলামিস্টরা মনে করেন, লায়ন যদি তার ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, তবে তিনি অন্তত ৬৫০ উইকেটের গণ্ডি অনায়াসেই পার করবেন। তবে ওয়ার্নকে ছোঁয়া নির্ভর করবে অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন ভারত সফর এবং ঘরের মাঠে ব্যস্ত সূচির ওপর। লায়ন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার স্পিন আক্রমণের একমাত্র ভরসা, এবং তার ব্যাকআপ হিসেবে এখনো কোনো বিশ্বমানের স্পিনার তৈরি হয়নি। ফলে দলের প্রয়োজনে তাকে আগামী দুই-তিন বছর নিয়মিত পারফর্ম করতে হবে। এই মানসিক চাপ সামলানোই হবে তার ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নের প্রধান পরীক্ষা।
ইংল্যান্ডের ব্যাটিং বিপর্যয় এবং প্যাট কামিন্সের ভূমিকা কী ছিল?
অ্যাডিলেড টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ইংল্যান্ডের ১৩২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পেছনে লায়নের পাশাপাশি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কামিন্স তার চোট কাটিয়ে ফিরে এসে শুরুতেই জ্যাক ক্রলিকে আউট করে প্রথম আঘাত হানেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল জো রুটকে আউট করা। কামিন্স টেস্ট ক্রিকেটে এই নিয়ে ১২ বার রুটকে আউট করলেন, যা একটি বিশ্ব রেকর্ড। রুট যখন উইকেটে থিতু হতে যাচ্ছিলেন, তখনই কামিন্সের আউটসুইং রুটের ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটকিপারের হাতে চলে যায়।
ইংল্যান্ডের এই ব্যাটিং বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল অজি বোলারদের লুজ বল না দেওয়া। হ্যারি ব্রুক ৬৩ বলে ৪৫ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও ক্যামরন গ্রিনের বলে তিনি আউট হন। লায়ন এবং কামিন্সের বোলিং পার্টনারশিপ ইংল্যান্ডের মিডল অর্ডারকে কোনো সুযোগই দেয়নি। বিবিসি স্পোর্টস (BBC) এর তথ্যমতে, ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিনের বিপক্ষে সুইপ শট খেলতে গিয়ে বারবার বিভ্রান্ত হয়েছেন, যা লায়নকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। চা বিরতির আগে ইংল্যান্ডের এই অবস্থা অস্ট্রেলিয়ার জন্য ম্যাচে জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।
লায়নের এই সাফল্য অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের জন্য কী বার্তা বহন করে?
নাথান লায়নের এই অর্জন অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট এবং স্পিন বোলিং সংস্কৃতির জন্য একটি বড় বিজয়। দীর্ঘকাল ধরে অস্ট্রেলিয়াকে কেবল পেসারদের স্বর্গরাজ্য মনে করা হলেও, লায়ন প্রমাণ করেছেন যে একজন অফ-স্পিনারও এখানকার উইকেটে সফল হতে পারেন। ৫৬৪ উইকেট নেওয়ার মাধ্যমে তিনি কেবল ম্যাকগ্রাকেই ছাড়িয়ে যাননি, বরং তিনি তরুণ স্পিনারদের জন্য একটি পথরেখা তৈরি করেছেন। অস্ট্রেলীয় কোচিং স্টাফ এবং নির্বাচকদের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয় যে, তাদের স্পিন বিভাগ একজন অভিজ্ঞ সেনাপতির হাতে নিরাপদ।
অফিসিয়াল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (CA) প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, লায়নের এই মাইলফলক উদযাপনে তারা বিশেষ সম্মাননার পরিকল্পনা করছে। লায়ন যখন ২০১০ সালে অ্যাডিলেড ওভালে কিউরেটর হিসেবে কাজ করতেন, তখন কেউ ভাবেনি যে একদিন এই মাঠেই তিনি ইতিহাসের অংশ হবেন। তার এই জার্নিটি লড়াকু মানসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের মূল লক্ষ্য হবে লায়নের বিদায়ের আগে একজন যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে বের করা, যাতে ওয়ার্ন ও লায়নের তৈরি করা স্পিন ঐতিহ্য ম্লান না হয়ে যায়।
FAQ;
১. নাথান লায়ন বর্তমানে কতটি টেস্ট উইকেটের মালিক?
নাথান লায়ন বর্তমানে ১৪০টি টেস্ট ম্যাচে ৫৬৪টি উইকেটের মালিক (অ্যাডিলেড টেস্টের দ্বিতীয় দিনের আপডেট অনুযায়ী)।
২. তিনি কোন কিংবদন্তি বোলারকে ছাড়িয়ে গেছেন?
তিনি অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রাকে (৫৬৩ উইকেট) ছাড়িয়ে গেছেন।
৩. অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট কার?
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নের (৭০৮ উইকেট)।
৪. নাথান লায়ন টেস্টে কতবার ৫ উইকেট নিয়েছেন?
তিনি তার টেস্ট ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত মোট ২৪ বার পাঁচ উইকেট এবং ৫ বার দশ উইকেট শিকার করেছেন।
৫. লায়ন কি শেন ওয়ার্নের রেকর্ড ভাঙতে পারবেন?
লায়ন বর্তমানে ওয়ার্নের চেয়ে ১৪৪ উইকেট পিছিয়ে আছেন। তিনি ২০২৭ পর্যন্ত খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে রেকর্ড ভাঙাটা ফিটনেস ও পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করছে।
উপসংহার:
নাথান লায়ন ৫৬৪ উইকেট শিকারের মাধ্যমে গ্লেন ম্যাকগ্রাকে ছাড়িয়ে আজ অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এক অনন্য ইতিহাস গড়লেন। কিউরেটর থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠার এই যাত্রা কেবল পরিশ্রমের নয়, বরং অফ-স্পিন শিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। শেন ওয়ার্নের পাহাড়সম ৭০৮ উইকেটের রেকর্ড হয়তো এখনো অনেক দূরে, কিন্তু লায়নের বর্তমান ফর্ম এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত খেলার মানসিকতা তাকে সেই লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই অর্জন তাকে কেবল সেরাদের তালিকায় স্থান দেয়নি, বরং আধুনিক ক্রিকেটে একজন ‘মডার্ন ডে লিজেন্ড’ হিসেবে তার নাম চিরস্থায়ী করে দিল।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News






