আরব কাপ ২০২৫ শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে জর্ডানকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতল মরক্কো। আব্দের রাজ্জাকের জোড়া গোল এবং নাটকীয় অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ের বিস্তারিত পড়ুন এখানে। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ২০২৫ আরব কাপের ফাইনালে জর্ডানকে ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে মরক্কো। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ২-২ সমতায় থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০০ মিনিটে আব্দের রাজ্জাক হামদাল্লাহর জয়সূচক গোল মরক্কোকে দ্বিতীয়বারের মতো এই আসরের চ্যাম্পিয়ন বানায়। এই জয়ের ফলে ২০১২ সালের পর আবারও আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরল অ্যাটলাস লায়ন্সরা, যা আসন্ন আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে তাদের জন্য বড় আত্মবিশ্বাসের জোগান দেবে।
মরক্কো বনাম জর্ডান ফাইনাল ম্যাচের সূচনা কেমন ছিল?
লুসাইলের আইকনিক ভেন্যুতে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে মরক্কো। খেলার মাত্র ৪ মিনিটের মাথায় তান্নানে প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য দূরপাল্লার শটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। এই গোলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং শুরুতেই জর্ডান রক্ষণভাগকে অগোছালো করে দেয়। তবে জর্ডান গোলকিপার আবু লায়লা (বা ইয়াজিদ আবু লায়লা) বেশ কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে ব্যবধান বাড়তে দেননি। বিশেষ করে ১৩ মিনিটে কারিম এল বেরকাউয়ির জোরালো শট রুখে দিয়ে তিনি জর্ডানকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন, যা প্রথমার্ধের লড়াইকে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলেছিল।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে মরক্কো বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও জর্ডান কাউন্টার অ্যাটাকে বেশ কিছু বিপদজনক সুযোগ তৈরি করে। ৩৩ মিনিটে হুসাম আবু আল দাহাবের একটি বুলেট গতির হেড মরক্কোর গোলকিপার মেহদি বেনাবিদ অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ফিরিয়ে না দিলে তখনই সমতায় ফিরতে পারত জর্ডান। মরক্কোর রক্ষণভাগের আশরাফ এল মাহদিওই এবং মারওয়ানে সাদান জর্ডানের উইঙ্গারদের কড়া মার্কিংয়ে রাখলেও প্রথমার্ধের শেষে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় মরক্কো। তবে এই লিড যে নিরাপদ ছিল না, তা দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বোঝা যায় যখন জর্ডান তাদের কৌশল পরিবর্তন করে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে।
আরব কাপ ২০২৫ দ্বিতীয়ার্ধে জর্ডান কীভাবে ম্যাচে ফিরে এসেছিল?
বিরতির পর জর্ডান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে মাঠে ফেরে এবং মরক্কোর ডিফেন্স লাইনকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখে। ম্যাচের একটি কর্নার কিক থেকে পাওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মোহান্নাদ আবু তাহার মাপা ক্রসে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করেন অরক্ষিত আলী ওলওয়ান। এই সমতাসূচক গোলটি লুসাইল স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার জর্ডানি দর্শককে উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়। মরক্কো সমতায় ফেরার পর পুনরায় আক্রমণে মনোনিবেশ করলেও জর্ডানের জমাটবদ্ধ রক্ষণ ভাঙতে হিমশিম খাচ্ছিল। খেলার ৬৮ মিনিটে নাটকীয় মোড় নেয় যখন ডি-বক্সের ভেতর হ্যান্ডবল করায় ভিএআর (VAR) চেক শেষে পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি।
পেনাল্টি থেকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে জর্ডানকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন সেই আলী ওলওয়ান। মরক্কোর মিডফিল্ডার আশরাফ এল মাহদিওইয়ের অনিচ্ছাকৃত হ্যান্ডবলটি তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে থাকে এবং কোচ একের পর এক পরিবর্তন আনেন। জর্ডান যখন তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম আরব কাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ৮৭ মিনিটে আব্দের রাজ্জাক এক বিতর্কিত ও সৌভাগ্যের গোলে মরক্কোকে ২-২ সমতায় ফেরান। জর্ডান গোলরক্ষক প্রথম দফার হেড ফিরিয়ে দিলেও রিবাউন্ড বলটি আব্দের রাজ্জাকের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়, যা ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নেয়।
অতিরিক্ত সময়ে মরক্কোর জয়ের নায়ক কে ছিলেন?
অতিরিক্ত সময়ের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে ক্লান্তি লক্ষ্য করা গেলেও জয়ের নেশা ছিল প্রবল। খেলার ১০০ মিনিটের মাথায় আবারও ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন মরক্কোর অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড আব্দের রাজ্জাক হামদাল্লাহ। একটি কর্নার থেকে আসা বল মারওয়ানে সাদানের মাথায় লেগে যখন গোলপোস্টের কাছে আসে, তখন আল শাবাবের এই স্ট্রাইকার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। এটি ছিল ম্যাচে তার দ্বিতীয় গোল, যা শেষ পর্যন্ত জয়সূচক হিসেবে প্রমাণিত হয়। জর্ডান শেষ ১৫ মিনিটে সমতায় ফেরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেও মরক্কোর রক্ষণভাগ এবার আর কোনো ভুল করেনি।
এই জয়ের ফলে মরক্কো তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার আরব কাপ শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করল। এর আগে ২০১২ সালে তারা প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় মরক্কোর কোচ বলেন, “এটি ছিল আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা। জর্ডান অসাধারণ ফুটবল খেলেছে, কিন্তু আমাদের ফুটবলারদের মানসিক শক্তিই আজ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।” এই জয় মরক্কোর ফুটবলের স্বর্ণযুগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, ফাইনালে হারলেও জর্ডানের এই লড়াই ফুটবল বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে, বিশেষ করে তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন।
এক নজরে আরব কাপ ২০২৫ ফাইনাল
| বিষয় | তথ্য |
| বিজেতা | মরক্কো (৩-২) |
| রানার্স-আপ | জর্ডান |
| ভেন্যু | লুসাইল স্টেডিয়াম, কাতার |
| ম্যান অফ দ্য ম্যাচ | আব্দের রাজ্জাক (মরক্কো) |
| গোলদাতা (মরক্কো) | তান্নানে (৪’), আব্দের রাজ্জাক (৮৭’, ১০০’) |
| গোলদাতা (জর্ডান) | আলী ওলওয়ান (সমতা ও পেনাল্টি) |
| রেফারি সিদ্ধান্ত | ভিএআর (VAR) এর মাধ্যমে পেনাল্টি প্রদান |
বিশ্ব গণমাধ্যম ও ফুটবল কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স (Reuters) এই ম্যাচকে “আরব ফুটবলের ক্লাসিক লড়াই” হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোর এই জয় উত্তর আফ্রিকার ফুটবলের আধিপত্যকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করল। ফিফা প্রেসিডেন্ট যিনি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন, তিনি ম্যাচ শেষে উভয় দলের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে বলেন, “আরব ফুটবল এখন বিশ্বমানের, এবং লুসাইল স্টেডিয়ামের এই পরিবেশই তার প্রমাণ।” মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শিরোপা জয়ের জন্য প্রত্যেক খেলোয়াড়কে বিশেষ বোনাস প্রদান করা হবে।
দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian) তাদের বিশ্লেষণে মরক্কোর আব্দের রাজ্জাকের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, “একজন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডের গুরুত্ব যে কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে অপরিসীম, যা আজ রাজ্জাক প্রমাণ করেছেন।” জর্ডানের কোচ ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত হতাশ হয়ে বলেন, “আমরা শিরোপার খুব কাছে ছিলাম, কিন্তু ছোট ছোট ভুল আমাদের বড় মূল্য দিতে বাধ্য করেছে। তবুও আমি আমার ছেলেদের নিয়ে গর্বিত।” এই জয়ের প্রভাব মরক্কোর ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
FAQ:
১. মরক্কো এর আগে কতবার আরব কাপ জিতেছে?
মরক্কো এর আগে ২০১২ সালে একবার এই শিরোপা জিতেছিল। ২০২৫ সালের এই জয়টি তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় আরব কাপ শিরোপা।
২. ফাইনাল ম্যাচে মরক্কোর হয়ে গোলগুলো কে কে করেছেন?
মরক্কোর হয়ে প্রথম গোলটি করেন তান্নানে (৪ মিনিটে) এবং বাকি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন আব্দের রাজ্জাক (৮৭ এবং ১০০ মিনিটে)।
৩. জর্ডান কি কখনও আরব কাপ জিতেছে?
না, জর্ডান এখন পর্যন্ত আরব কাপ শিরোপা জিততে পারেনি। ২০২৫ সালের এই ফাইনালটি ছিল তাদের অন্যতম সফল যাত্রা।
৪. ম্যাচটি কোন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
ফাইনাল ম্যাচটি কাতারের আইকনিক লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল।
৫. মরক্কোর পরবর্তী বড় লক্ষ্য কী?
আরব কাপ জয়ের পর মরক্কোর পরবর্তী লক্ষ্য হলো আগামী সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স (AFCON) প্রতিযোগিতায় ভালো ফলাফল করা।
৬. পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?
ম্যাচের ৬৮ মিনিটে মরক্কোর ডিফেন্ডার আশরাফ এল মাহদিওইয়ের হ্যান্ডবল হওয়ার পর রেফারি VAR (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) চেক করে জর্ডানকে পেনাল্টি দেন।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার:
মরক্কোর এই আরব কাপ ২০২৫ জয় কেবল একটি টুর্নামেন্ট জয় নয়, বরং এটি তাদের ফুটবলীয় কাঠামোর উন্নতির প্রতিফলন। ২০১২ সালের সাফল্যের ১৩ বছর পর পুনরায় এই গৌরব অর্জন প্রমাণ করে যে, মরক্কো বর্তমানে আরব এবং আফ্রিকান ফুটবলের একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আব্দের রাজ্জাকের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সাথে তরুণ প্রতিভাদের সংমিশ্রণ মরক্কোকে এই টুর্নামেন্টে অজেয় করে তুলেছিল। বিশেষ করে ফাইনাল ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরেও যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা যে কোনো দলের জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ক। এই জয় তাদের আসন্ন আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখবে।
অন্যদিকে, জর্ডানের জন্য এই পরাজয় অত্যন্ত কষ্টের হলেও, তাদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত জর্ডানের যাত্রা ছিল রূপকথার মতো। আলী ওলওয়ানের জোড়া গোল এবং রক্ষণের দৃঢ়তা জর্ডানকে শিরোপার খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তারা প্রমাণ করেছে যে আরব বিশ্বের ফুটবল কেবল উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন সমানে সমান পাল্লা দিতে সক্ষম। লুসাইল স্টেডিয়ামের এই মহাকাব্যিক লড়াই ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ফাইনাল হিসেবে স্মরণে থাকবে। পরিশেষে, মরক্কোর এই রাজকীয় জয় বিশ্ব ফুটবলে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত করল এবং আগামী দিনের বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তাদের ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News




