শিরোনাম

ফিফা বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বজয় জাখোর!

ফিফা বেস্ট ফ্যান ফুটবল কি শুধুই একটি খেলা? নাকি এটি আবেগ, ভালোবাসা এবং মানবতার এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা কোনো বন্ধন? ইরাকের ফুটবল ক্লাব জাখো এসসি (Zakho SC)-এর সমর্থকরা প্রমাণ করে দিলেন যে, ফুটবল মাঠ কেবল গোল আর জয়ের উল্লাস নয়, বরং মানবতার সেবার এক বিশাল মঞ্চও হতে পারে। গত রাতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অনুষ্ঠিত জমকালো ‘দা বেস্ট’ ফিফা ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে ফিফা বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে এই ক্লাবের সমর্থকরা।

তাদের অপরাধ? তারা খেলার মাঠে বিশৃঙ্খলা করেনি, বরং অসুস্থ শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে গ্যালারি থেকে মাঠে ছুঁড়ে দিয়েছিল হাজার হাজার রঙিন খেলনা। জাখো এসসি-এর সমর্থকদের এই মানবিক উদ্যোগ কেবল কুর্দিস্তান বা ইরাক নয়, পুরো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এক নজিরবিহীন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানব, কীভাবে একটি সাধারণ ফুটবল ম্যাচ হয়ে উঠল মানবতার মহোৎসব এবং কীভাবে জাখোর সমর্থকরা জিতে নিল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার স্বীকৃতি।

ফিফা বেস্ট ফ্যান ১৩ মে-র সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্য: খেলনার বৃষ্টি

ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৩ মে, ইরাকের স্টার্স লিগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। সেদিন জাখো এসসি-এর প্রতিপক্ষ ছিল আল-হুদুদ ক্লাব। সাধারণত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে গ্যালারিতে স্লোগান, আতশবাজি বা কখনও কখনও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় দেখা যায়। কিন্তু সেদিন জাখো স্টেডিয়ামের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ম্যাচ শুরুর আগে বা মাঝবিরতিতে নয়, খেলার একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে গ্যালারি থেকে হঠাৎ মাঠে নেমে এল রঙের ঝরনা। তবে সেটি কোনো কাগজ বা কনফেটি ছিল না। হাজার হাজার দর্শক তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা পুতুল, টেডি বিয়ার এবং নানা ধরনের খেলনা ছুঁড়ে মারতে শুরু করেন মাঠের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই সবুজ ঘাসের মাঠ ঢেকে যায় প্রায় ৩০ হাজার খেলনার রঙিন স্তূপে।

এই দৃশ্য দেখে খেলোয়াড়, রেফারি এবং ধারাভাষ্যকাররা পর্যন্ত অবাক হয়ে যান। এটি কোনো প্রতিবাদের ভাষা ছিল না, এটি ছিল ভালোবাসার ভাষা। এই খেলনাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল ওই অঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থ শিশুদের জন্য। যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত ইরাক এবং কুর্দিস্তান অঞ্চলের শিশুদের মানসিক প্রশান্তির জন্য সমর্থকদের এই উদ্যোগ ছিল এক কথায় অভাবনীয়।

কেন এই উদ্যোগ? মানবিকতার ডাক

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এখানকার শিশুদের শৈশব অনেক ক্ষেত্রেই আনন্দহীন। বিশেষ করে যারা অসুস্থ, তাদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি।

জাখো এসসি-এর ফ্যানবেস বা সমর্থকরা নিজেদের কেবল দর্শক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তারা অনুধাবন করেছিলেন যে, ক্লাবের প্রতি ভালোবাসাকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, এমন কিছু করবেন যা বিশ্বকে দেখাবে যে ফুটবল মানেই ধ্বংস বা উগ্রতা নয়। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে থাকা ক্যান্সার আক্রান্ত ও অন্যান্য জটিল রোগে ভোগা শিশুদের পাশে দাঁড়াতেই তারা এই ‘টয় টস’ বা খেলনা নিক্ষেপের পরিকল্পনা করেন।

এই খেলনাগুলো পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবক এবং ক্লাব কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংগ্রহ করে পৌঁছে দেওয়া হয় সেইসব শিশুদের হাতে, যাদের কাছে একটি নতুন খেলনা মানেই এক চিলতে অমলিন হাসি।

ফিফা বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড জয়: বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি

গতকাল রাতে অনুষ্ঠিত ফিফা ‘দা বেস্ট’ ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস-এ যখন সেরা সমর্থকদের ক্যাটাগরিতে জাখো এসসি-এর নাম ঘোষণা করা হয়, তখন তা ছিল ইরাকের ফুটবলের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সাধারণত লাতিন আমেরিকা বা ইউরোপের বিখ্যাত ক্লাবগুলোর সমর্থকরা তাদের জাঁকজমকপূর্ণ উল্লাসের জন্য এই পুরস্কারের তালিকায় থাকে। কিন্তু এবার ফিফা বেছে নিয়েছে মানবিকতাকে।

ফিফা তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ফুটবল যে মানুষকে এক করতে পারে এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, জাখোর সমর্থকরা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের এই কাজ খেলার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।”

এই পুরস্কারটি কেবল একটি ট্রফি নয়; এটি সম্প্রীতি, ঐক্য ও দৃঢ়তার প্রতীক। কুর্দিস্তান অঞ্চলের একটি ক্লাব হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই স্বীকৃতি তাদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

জাখো শহরে বাঁধভাঙা উল্লাস

পুরস্কারের খবরটি ইরাকে পৌঁছানো মাত্রই জাখো শহরে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। গভীর রাত হওয়া সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। শহরের অলিতে-গলিতে শুরু হয় আনন্দ মিছিল।

  • শিশুদের উল্লাস: শহরের শিশু ও কিশোররা ক্লাবের জার্সি গায়ে দিয়ে নেচে-গেয়ে উদযাপন করে। তাদের হাতে ছিল ক্লাবের পতাকা এবং ‘আমরাই সেরা’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
  • আতশবাজি: শহরের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আতশবাজির ঝলকানিতে।
  • গর্বের প্রতিফলন: স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই পুরস্কার তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর কষ্টের মাঝে এক পশলা স্বস্তির বাতাস। তারা প্রমাণ করেছে, ভালোবাসার শক্তি দিয়ে বিশ্ব জয় করা সম্ভব।

এই উদযাপন প্রমাণ করে, জাখো এসসি এবং এর সমর্থকদের সম্পর্ক কতটা গভীর। এটি কেবল একটি ক্লাব নয়, এটি তাদের পরিচয়ের একটি অংশ।

অধিনায়ক আহমেদ ইব্রাহিমের প্রতিক্রিয়া

ক্লাবের এই অর্জনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জাখো এসসি-এর অধিনায়ক আহমেদ ইব্রাহিম। তিনি এই পুরস্কারকে সমর্থকদের প্রাপ্য বলে অভিহিত করেন।

আহমেদ ইব্রাহিম বলেন:

“শিশুদের সাহায্য করার জন্য মাঠে খেলনা নিক্ষেপ ছিল একটা দুর্দান্ত কাজ। আমাদের অঞ্চলে অনেক শিশু আছে যাদের চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন। এই ধরনের কাজ এবং ভক্তরা যে অর্থ উত্তলন করেন, তা ওই শিশুদের সহায়তা করে। আমাদের সমর্থকরাই আমাদের আসল শক্তি।”

অধিনায়কের এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে যে, খেলোয়াড়রাও সমর্থকদের এই মানবিক কাজের দ্বারা কতটা অনুপ্রাণিত। মাঠের খেলায় জয়ের চেয়েও মাঠের বাইরের এই জয় তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।

ফিফা ফ্যান অ্যাওয়ার্ডের ইতিহাস ও গুরুত্ব

২০১৬ সাল থেকে ফিফা এই বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড চালু করে। এর মূল লক্ষ্য হলো—ফুটবলের সেইসব সমর্থকদের স্বীকৃতি দেওয়া, যারা খেলার প্রতি আবেগের পাশাপাশি মানবিক দায়বদ্ধতার অনন্য নজির স্থাপন করেন।

অতীতে আমরা দেখেছি লিভারপুল ও ডর্টমুন্ডের সমর্থকদের ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ গাওয়ার দৃশ্য বা স্কটল্যান্ডের সেল্টিক ফ্যানদের মানবিক কার্যক্রম পুরস্কৃত হতে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ইরাকের জাখো এসসি। এই পুরস্কার প্রমাণ করে যে, আপনি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, ভালো কাজ কখনোই বৃথা যায় না। ফিফার এই মঞ্চে জাখোর নাম উচ্চারিত হওয়া মানে পুরো বিশ্বের সামনে ইরাকের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা।

FAQ;

১. কোন ক্লাব ২০২৫ সালের ফিফা বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড জিতেছে?

উত্তর: ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের ক্লাব জাখো এসসি (Zakho SC)-এর সমর্থকরা এই পুরস্কার জিতেছে।

২. কেন জাখো এসসি-এর সমর্থকরা এই পুরস্কার পেল?

উত্তর: অসুস্থ শিশুদের মাঝে বিতরণের জন্য মাঠে প্রায় ৩০ হাজার খেলনা ছুঁড়ে দেওয়ার মানবিক উদ্যোগের জন্য তারা এই স্বীকৃতি পেয়েছে।

৩. মাঠে খেলনা ছুঁড়ে দেওয়ার ঘটনাটি কবে ঘটেছিল?

উত্তর: ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৩ মে, ২০২৫ তারিখে আল-হুদুদ ক্লাবের বিপক্ষে একটি ম্যাচের সময়।

৪. ফিফা ফ্যান অ্যাওয়ার্ড কবে থেকে চালু হয়?

উত্তর: ২০১৬ সাল থেকে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সেরা সমর্থকদের স্বীকৃতি দিতে এই পুরস্কার চালু করে।

৫. জাখো এসসি-এর অধিনায়ক কে?

উত্তর: জাখো এসসি-এর বর্তমান অধিনায়ক হলেন আহমেদ ইব্রাহিম

৬. সংগৃহীত খেলনাগুলো নিয়ে কী করা হয়েছিল?

উত্তর: মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পর খেলনাগুলো ওই অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন অসুস্থ শিশুদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

JitaBet ,  JitaWin , এবং  JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন,   তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ফিফা বেস্ট ফ্যান অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ কেবল একটি ট্রফি নয়, এটি মানবতার এক বিশাল স্বীকৃতি। ইরাকের জাখো এসসি-এর সমর্থকরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে, খেলার মাঠের প্রতিযোগিতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী।

৩০ হাজার খেলনা যখন আকাশ থেকে মাঠে ঝরে পড়ছিল, তখন সেটি কেবল প্লাস্টিকের পুতুল ছিল না; সেটি ছিল হাজারো শিশুর জন্য আশার আলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অঞ্চল থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে এমন সম্মান অর্জন করা সহজ কথা নয়। জাখোর এই অর্জন বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের অনুপ্রাণিত করবে আরও বেশি মানবিক কাজে এগিয়ে আসতে। ফুটবল বেঁচে থাকুক তার আপন মহিমায়, আর সমর্থকরা বেঁচে থাকুক এমন মানবিক উদ্যোগে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News