ফিফা শান্তি পুরস্কার ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করে। ফিফার স্লোগানই হলো ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বকে এক করা। কিন্তু সম্প্রতি সেই ঐক্যের মঞ্চে রাজনীতির নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে খোদ ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধেই। ফিফা শান্তি পুরস্কার (FIFA Peace Prize) নামক একটি নতুন এবং নজিরবিহীন পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) হাতে তুলে দিয়ে বড়সড় বিপদে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino)।
গত ৫ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার হস্তান্তরের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথা থাকলেও, তিনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রতি যে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, তা ফিফার নিজস্ব সংবিধান বা ‘স্ট্যাটিউট’ বিরোধী। মানবাধিকার সংস্থা ‘ফেয়ারস্কোয়ার’ (FairSquare) ইতিমধ্যেই ফিফার এথিক্স কমিটির কাছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। এই ঘটনা ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফিফার ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ফিফা শান্তি পুরস্কার’: একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা
ফিফার ইতিহাসে আগে কখনো ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ বা ‘FIFA Peace Prize’ নামক কোনো স্বীকৃতির অস্তিত্ব ছিল না। হঠাৎ করে এই পুরস্কার চালু করা এবং তার প্রথম গ্রহীতা হিসেবে একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রপ্রধানকে বেছে নেওয়া—পুরো বিষয়টিই রহস্যজনক এবং বিতর্কিত।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট
ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত কেনেডি সেন্টারে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ট্রাম্পের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কার হিসেবে ট্রাম্পকে দেওয়া হয়:
- একটি বড় সোনালি ট্রফি।
- একটি বিশেষ মেডেল।
- একটি সনদপত্র।
পুরস্কার দেওয়ার মুহূর্তে ইনফান্তিনো ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “একজন নেতার মধ্যে আমরা যা চাই, তা-ই তিনি প্রদর্শন করেছেন।” এখানেই থামেননি তিনি, যোগ করেছেন, “মি. প্রেসিডেন্ট, আমার সমর্থন সবসময়ই আপনার সঙ্গে থাকবে।” একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার প্রধানের মুখে এমন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করেছে।
নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন: ফিফার আইনে কী আছে?
ফিফার সংবিধান বা স্ট্যাটিউট অনুযায়ী, ফিফা একটি অরাজনৈতিক সংস্থা। ফিফার কোড অব এথিক্স এবং স্ট্যাটিউটে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ফিফা এবং এর কর্মকর্তারা সব ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে ‘নিরপেক্ষ’ (Neutral) থাকবেন।
ফেয়ারস্কোয়ারের গুরুতর অভিযোগ
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফেয়ারস্কোয়ার’ (FairSquare) বিবিসি স্পোর্টের কাছে একটি অভিযোগপত্র পেশ করেছে। তাদের দাবি, ইনফান্তিনো ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার অন্তত চারটি মৌলিক নিয়ম স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছেন।
ফেয়ারস্কোয়ার তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে:
“একজন দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক নেতাকে এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া নিজেই ফিফার নিরপেক্ষতার নীতির একটি স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফিফা সভাপতি সংস্থার লক্ষ্য, কৌশলগত দিকনির্দেশনা, নীতি বা মূল্যবোধ একতরফাভাবে ঠিক করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না।”
সংস্থাটি ফিফার স্বাধীন এথিক্স কমিটির কাছে দাবি জানিয়েছে, যেন তারা অবিলম্বে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
ইনফান্তিনো ও ট্রাম্প: বন্ধুত্বের আড়ালে রাজনৈতিক এজেন্ডা?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পকে পুরস্কার দেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং গত কয়েক মাস ধরে ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ডে ট্রাম্পের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
১. নোবেল শান্তি পুরস্কারের সুপারিশ: গত অক্টোবর মাসে ইনফান্তিনো তার ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট শেয়ার করে লিখেছিলেন, “ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের পুরোপুরি যোগ্য।” একজন ফিফা প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন রাজনৈতিক মন্তব্য নজিরবিহীন।
২. মায়ামি বিজনেস ফোরামের মন্তব্য: গত নভেম্বরে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত ‘আমেরিকান বিজনেস ফোরাম’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, “আমাদের উচিত ট্রাম্প যা করছেন (যুক্তরাষ্ট্রে) তাকে সমর্থন করা, কারণ আমার মনে হয়, পরিস্থিতি বেশ ভালোই দেখাচ্ছে।”
৩. অভিষেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ ও প্রতিক্রিয়া: জানুয়ারি মাসে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর ইনফান্তিনো ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ফেয়ারস্কোয়ারের মতে, ওই ভিডিওতেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রতি ইনফান্তিনোর সমর্থনের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।
এই সব কিছুই প্রমাণ করে যে, ইনফান্তিনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে ফিফার মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়েছেন।
ফিফার শাসনব্যবস্থা ও ইনফান্তিনোর স্বেচ্ছাচারিতা
এই বিতর্ক কেবল একটি পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ফিফার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা বা গভর্ন্যান্স স্ট্রাকচার (Governance Structure) নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, ইনফান্তিনো ফিফাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছেন।
ফেয়ারস্কোয়ারের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নিকোলাস ম্যাকগিহান (Nicholas McGeehan) এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন:
“এই অভিযোগ কেবল ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রতি ইনফান্তিনোর সমর্থন নিয়ে নয়। আরও বিস্তৃতভাবে এটি দেখায়—ফিফার অদ্ভুত শাসনব্যবস্থা কীভাবে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সংস্থার নিয়ম খোলাখুলিভাবে ভঙ্গ করার সুযোগ দিয়েছে, এবং এমন আচরণ করতে দিয়েছে যা বিপজ্জনক এবং বিশ্বের জনস্বার্থের সম্পূর্ণ বিপরীত।”
ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়াই এমন একটি নতুন পুরস্কার চালু করা এবং তা একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাকে প্রদান করা ইনফান্তিনোর একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অনেকে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ওপর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফিফা সভাপতির এই অতি-ঘনিষ্ঠতা টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
- ভাবমূর্তি সংকট: বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘#FIFACorruption’ এবং ‘#InfantinoOut’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করছে।
- কূটনৈতিক জটিলতা: ফিফার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অনেকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈরিতা রয়েছে। ইনফান্তিনোর এই প্রকাশ্য সমর্থন সেই দেশগুলোকে ফিফার প্রতি আস্থাহীন করে তুলতে পারে।
- এথিক্স কমিটির ভূমিকা: এখন সবার নজর ফিফার এথিক্স কমিটির দিকে। তারা কি আদৌ তাদের সভাপতির বিরুদ্ধে তদন্ত করার সাহস দেখাবে? নাকি এটিও ধামাচাপা পড়ে যাবে? অতীত ইতিহাস বলছে, এথিক্স কমিটি খুব কম সময়েই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার:
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দিয়ে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তা সহজে মিটবে বলে মনে হয় না। ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার প্রধান হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল খেলার পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করা। কিন্তু তিনি তা না করে ফিফাকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘অলৌকিক’ চিকিৎসকের কাছে নেইমারের যাওয়ার খবর যেমন ভক্তদের আশা জোগায়, তেমনি ইনফান্তিনোর এমন কর্মকাণ্ড ভক্তদের হতাশ করে। ফেয়ারস্কোয়ারের অভিযোগ যদি আমলে নেওয়া হয় এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তবে ইনফান্তিনো বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। তবে ফিফার বর্তমান কাঠামোতে তা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দিনশেষে, ফুটবল যেন রাজনীতির দাবার ঘুঁটি না হয়, এটাই সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা। ইনফান্তিনোর এই পদক্ষেপ কি ফিফার কফিনে শেষ পেরেক, নাকি ক্ষমতার জোরে তিনি পার পেয়ে যাবেন তা দেখার জন্য বিশ্ব এখন অপেক্ষায়।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News






