এমবাপে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদ-এর জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। মাঠে টানা ড্র, খেলোয়াড়দের ছন্দহীনতা এবং ড্রেসিংরুমে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের গুঞ্জনে ক্লাবটির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। স্প্যানিশ জায়ান্টদের এমন ছন্নছাড়া দশা ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ জানে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আর এই প্রত্যাবর্তনের গল্পে আবারও ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপে।
লা লিগার ম্যাচে গতকাল রাতে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের মাঠে আতিথ্য নেয় রিয়াল। যেখানে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ না দিয়েই ৩-০ গোলের বিশাল জয় তুলে নিয়েছে লস ব্লাঙ্কোসরা। এমবাপের জোড়া গোল এবং এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার একটি গোল শুধু ৩টি পয়েন্টই নিশ্চিত করেনি, বরং বার্সেলোনার সাথে শিরোপার লড়াইয়ে রিয়ালকে আবারও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। কোচ জাভি আলোনসোর অধীনে এই জয়টি দলের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য ছিল অত্যন্ত জরুরি।
এমবাপের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স:
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। আর সেই আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। টানা তিন ড্রয়ের বৃত্ত ভাঙতে মরিপোক রিয়াল ম্যাচের শুরুতেই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয়।
ম্যাচের মাত্র ৭ম মিনিটে রিয়াল মাদ্রিদকে লিড এনে দেন এমবাপে। ইংলিশ ডিফেন্ডার ট্রেন্ট অ্যালেকজ্যান্ডার-আর্নল্ডের (যিনি এই টাইমলাইনে রিয়ালের খেলোয়াড়) বাড়ানো মাপা বলটি ডি-বক্সের বাইরে নিয়ন্ত্রণে নেন এমবাপে। এরপর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে তার ট্রেডমার্ক গতির শটে বল জালে জড়ান। এই ১-০ গোলের লিড রিয়ালের স্নায়ুচাপ কমাতে সাহায্য করে।
তবে এমবাপে এখানেই থামেননি। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে তিনি আবারও জ্বলে ওঠেন। আলভারো কারেরাসের পাস থেকে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বুলেট গতির শটে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন। এই গোলের মাধ্যমে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে বিশ্বের সেরা ফিনিশারদের একজন বলা হয়।
থিবো কোর্তোয়া: রিয়ালের রক্ষণদূর্গের অতন্দ্র প্রহরী
ফুটবলে গোলদাতারা সব আলো কেড়ে নিলেও, গোলরক্ষকের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। গতকালের ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের গোলপোস্টের নিচে থিবো কোর্তোয়া ছিলেন চীনের প্রাচীরের মতো।
ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে অ্যাথলেটিক বিলবাও বেশ কয়েকবার ভয়ংকর আক্রমণ শানায়। কিন্তু বেলজিয়ান এই গোলরক্ষকের ক্ষিপ্রতার কাছে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে প্রথমার্ধে এবং বিরতির পরপরই মিকেলের একটি দূরপাল্লা শট তিনি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় এক হাত দিয়ে ক্রসবারের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন। কোর্তোয়ার এই সেভগুলো না থাকলে ম্যাচের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। তার বিশ্বস্ত গ্লাভস রিয়ালের ‘ক্লিন শিট’ নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
কামাভিঙ্গার গোল এবং মধ্যমাঠের আধিপত্য
ম্যাচের ৪২ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তরুণ ফরাসি মিডফিল্ডার এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি শট বিলবাও গোলরক্ষক উনাই সিমন ঠেকিয়ে দিলেও, রিয়ালের আক্রমণের ঢেউ থামেনি। মিনিট চারেক পরেই একটি চমৎকার গোছানো আক্রমণ থেকে গোল করেন কামাভিঙ্গা।
এই ম্যাচে রিয়ালের মধ্যমাঠ ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। কামাভিঙ্গা, ভালভার্দে এবং বেলিংহামের কম্বিনেশন বিলবাওকে মাঝমাঠে কোনো স্পেস তৈরি করতে দেয়নি। বিশেষ করে কামাভিঙ্গার গোলটি ছিল রিয়ালের দলীয় সমন্বয়ের দারুণ উদাহরণ।
জাভি আলোনসোর ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস:
কোচ হিসেবে জাভি আলোনসো দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রিয়াল মাদ্রিদের খেলার ধরনে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। বিলবাওয়ের বিপক্ষে এই ম্যাচে তার সেই ‘ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস’ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এতদিন রিয়ালের খেলায় আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছিল, আলোনসো তা সমাধান করেছেন একটি হাই-প্রেসিং ৪-৩-৩ ফর্মেশনের মাধ্যমে। তিনি এমবাপেকে প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে আটকে না রেখে ফ্রি রোলে খেলার সুযোগ দিয়েছেন, যার ফলে ভিনিসিয়ুসের সাথে তার অবস্থানের অদলবদল প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। বিশেষ করে বল হারানোর সাথে সাথেই তা পুনরুদ্ধারে এমবাপে ও ভিনিসিয়ুসের বাড়তি তাড়না প্রমাণ করে যে, আলোনসো তার দলের সুপারস্টারদের মধ্যেও দলগত পরিশ্রমের মানসিকতা গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের ইম্প্যাক্ট:
রিয়াল মাদ্রিদের ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণের ধার বাড়াতে ইংলিশ রাইট-ব্যাক ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। টনি ক্রুসের বিদায়ের পর রিয়ালের লং বল এবং ক্রস বাড়ানোর যে অভাব ছিল, ট্রেন্ট যেন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করেছেন। এমবাপের প্রথম গোলের উৎস ছিল ট্রেন্টের নিখুঁত ভিশন এবং মাপা পাস। প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যুহ ভেদ করে তার বাড়ানো এই ধরণের পাসগুলোই এমবাপের মতো গতিশীল ফরোয়ার্ডের জন্য গোল করা সহজ করে দিচ্ছে। ডান প্রান্তে কারভাহালের অভিজ্ঞতার সাথে ট্রেন্টের এই সৃষ্টিশীলতা যোগ হওয়ায় রিয়ালের আক্রমণ এখন আর কেবল বাম পাশ (ভিনিসিয়ুস) নির্ভর নয়, বরং দুই প্রান্ত থেকেই সমান তালে ভীতি ছড়াচ্ছে।
তারুণ্যনির্ভর ইঞ্জিন রুম: মদ্রিচ পরবর্তী যুগের সূচনা
লুকা মদ্রিচ পরবর্তী যুগে রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যমাঠ কেমন হবে, তা নিয়ে অনেক জল্পনা ছিল। কিন্তু এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ফেদেরিকো ভালভার্দে এবং জুড বেলিংহামের সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান মিডফিল্ড সেই শঙ্কা পুরোপুরি দূর করে দিয়েছে। বিলবাওয়ের বিপক্ষে কামাভিঙ্গার গোলটি ছিল তার বক্স-টু-বক্স দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কেবল বল কেড়ে নেওয়া বা পাস দেওয়াই নয়, প্রয়োজন হলে ডি-বক্সে ঢুকে গোল করার ক্ষমতাও এই তরুণদের রয়েছে। তাদের অদম্য শক্তি এবং সারা মাঠ জুড়ে খেলার ক্ষমতা (Work Rate) রিয়াল মাদ্রিদকে এমন এক ‘ইঞ্জিন রুম’ উপহার দিয়েছে, যা প্রতিপক্ষের সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেওয়ার পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণেও সমানভাবে কার্যকর।
লা লিগা পয়েন্ট টেবিল: বার্সেলোনার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে রিয়াল
এই জয়ের ফলে লা লিগার শিরোপা দৌড় আরও জমে উঠল। টানা ড্রয়ের কারণে বার্সেলোনা থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল রিয়াল। কিন্তু বিলবাওকে হারানোর পর ব্যবধান এখন মাত্র ১ পয়েন্টের।
- ১ম স্থান: বার্সেলোনা (৩৭ পয়েন্ট – ১৫ ম্যাচ)
- ২য় স্থান: রিয়াল মাদ্রিদ (৩৬ পয়েন্ট – ১৫ ম্যাচে ১১ জয় ও ৩ ড্র)
- ৮ম স্থান: অ্যাথলেটিক বিলবাও (২০ পয়েন্ট – ১৫ ম্যাচ)
কোচ জাভি আলোনসো জানেন, লিগ জিততে হলে এখন আর পা হড়কানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি ম্যাচই এখন তাদের জন্য ফাইনাল।
পিচিচি ট্রফি: এমবাপের একক রাজত্ব
চলতি মৌসুমে লা লিগায় গোলদাতার তালিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন কিলিয়ান এমবাপে। বিলবাওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর ১৫ ম্যাচে তার মোট গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬টি। যা প্রমাণ করে, স্প্যানিশ লিগে মানিয়ে নিতে তার কোনো সমস্যাই হয়নি।
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বার্সেলোনার ফেরান তরেসের গোল সংখ্যা ৮টি। অর্থাৎ, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে দ্বিগুণ গোল করে ‘পিচিচি’ ট্রফির দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন এমবাপে।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার:
অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে এই জয়টি রিয়াল মাদ্রিদের জন্য কেবল ৩ পয়েন্ট নয়, বরং এটি একটি বার্তা। সমালোচকদের জবাব দিয়ে এবং দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে জাভি আলোনসোর দল যে আবারও বিধ্বংসী রূপে ফিরতে পারে, তা এই ম্যাচে প্রমাণিত হলো। রক্ষণভাগে কোর্তোয়ার দৃঢ়তা এবং আক্রমণভাগে এমবাপের খুনে মেজাজ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে রিয়াল মাদ্রিদ আবারও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। সামনে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ম্যাচ, যেখানে ঘরের মাঠে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে বার্সেলোনাকে টপকে শীর্ষে ওঠাই হবে লস ব্লাঙ্কোসদের একমাত্র লক্ষ্য।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News





