২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করলেন কার্লো আনচেলত্তি। চোট কাটিয়ে ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে দলে ফিরলেন রেকর্ড গোলদাতা নেইমার। পড়ুন বিস্তারিত। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র (Neymar Jr)। রিও ডি জেনিরোতে এক জমকালো সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তি (Carlo Ancelotti) তাঁর ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেন, যেখানে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছে সান্তোসের এই ৩৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডের নাম। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসিএল (ACL) ইনজুরিতে পড়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা এই তারকাকে দলে নেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে স্থানীয় ফুটবল বিশ্লেষকদের মাঝে তীব্র সংশয় ছিল। অবশেষে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আক্রমণভাগকে শক্তিশালী করতে আনচেলত্তি তাঁর অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রাখলেন।
কেন কার্লো আনচেলত্তি নেইমারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?
ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের ডাগআউটে বসার পর থেকে কোচ কার্লো আনচেলত্তি এই প্রথম কোনো স্কোয়াডে নেইমারকে অন্তর্ভুক্ত করলেন। গত মে ২০২৫-এ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড মূলত তরুণ ও শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট খেলোয়াড়দের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের দুই প্রধান ফরোয়ার্ড রদ্রিগো (Rodrygo) এবং তরুণ তুর্কি এস্তেভাও (Estevao)-এর মারাত্মক চোটের কারণে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের আগে সেলেসাওদের আক্রমণভাগ এক বড়সড় ধাক্কা খায়। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মাঠের ভেতরে ও বাইরে একজন যোগ্য নেতার অভাব দূর করতেই আনচেলত্তি নেইমারের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং এক্স-ফ্যাক্টরকে কাজে লাগানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
বাস্তবতা হলো, ব্রাজিলের হয়ে রেকর্ড ৭৯টি আন্তর্জাতিক গোল করা নেইমারকে দলে নেওয়া কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল নিখাদ কৌশলগত চাল। এই বিষয়ে রয়টার্সের এক অফিসিয়াল বিবৃতিতে Reuters World Cup coverage আনচেলত্তি বলেন, “নেইমার আমাদের ফুটবল সংস্কৃতির প্রতীক। সে হয়তো এখনো শতভাগ ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পায়নি, কিন্তু মাঠে তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের মনে যে ভীতি তৈরি করে এবং তরুণ খেলোয়াড়দের যেভাবে অনুপ্রাণিত করে, তা অমূল্য।” দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করে সান্তোসে যোগ দেওয়ার পর নেইমারের ফিটনেস গ্রাফ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে সেলেসাওদের মেডিকেল টিম, যার গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরই তাকে উত্তর আমেরিকার বিমান ধরার টিকিট দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্রাজিলের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কেমন?
নেইমারের বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়ার খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই ফুটবল বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে। ব্রাজিলের স্থানীয় ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এটিকে একটি ‘বিপজ্জনক জুয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড গত দুই বছর ধরে উচ্চ-তীব্রতার আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেননি। তবে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি সেলেসাও ভক্তদের মাঝে এই ঘোষণা এক নতুন উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে। বহু প্রাক্তন ফুটবলার মনে করছেন, হেক্সা জয়ের মিশনে নেইমারের মতো একজন অভিজ্ঞ বিশ্বমানের তারকার উপস্থিতি দলের আক্রমণভাগকে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ও বাইরে অনেক বেশি সৃজনশীল করে তুলবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এই মেগা নিউজকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে। এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে BBC Football News উল্লেখ করেছে যে, আনচেলত্তি গত সপ্তাহে ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশনের (CBF) সাথে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করার পর এটিই তাঁর নেওয়া সবচেয়ে বড় ও সাহসী সিদ্ধান্ত। অনেক সমালোচক দাবি করছেন, রদ্রিগোর অনুপস্থিতি ঢাকতে এটি একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও, নেইমার যদি টুর্নামেন্টের মাঝপথে পুনরায় ইনজুরিতে পড়েন, তবে তা ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে।
এক নজরে ২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্কোয়াড
| পজিশন | প্রধান খেলোয়াড়দের নাম | ক্লাব |
| গোলরক্ষক | অ্যালিসন, এদেরসন, ওয়েভারটন | লিভারপুল, ফেনারবাখ, গ্রেমিও |
| ডিফেন্ডার | মার্কুইনহোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালাহিস, দানিলো, ব্রেমার | পিএসজি, আর্সেনাল, জুভেন্টাস |
| মিডফিল্ডার | ব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো, লুকাস পাকেতা | নিউক্যাসেল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ফ্লেমিঙ্গো |
| ফরোয়ার্ড | ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহা, এন্ড্রিক, নেইমার | রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, অলিম্পিক লিওঁ, সান্তোস |
নেইমারের বর্তমান ইনজুরি স্ট্যাটাস ও ফিটনেস আপডেট কী?
২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে নেইমারের বাম হাঁটুর এসিএল (ACL) এবং মিনিসকাস ছিঁড়ে যায়। এরপর অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কারণে তাকে দীর্ঘকাল মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি আল-হিলাল থেকে পুনরায় তাঁর শৈশবের ক্লাব সান্তোসে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে ক্লাব ফুটবলে ফেরার পরও তাঁর ম্যাচ ফিটনেস এবং আগের সেই চিলতে গতি ফিরে পাওয়া নিয়ে বড় রকমের প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের ইনজুরি থেকে পুরোপুরি আগের ফর্মে ফেরা যেকোনো ৩৪ বছর বয়সী ফুটবলারের জন্যই অলৌকিক কিছু।
ব্রাজিল দলের মেডিকেল প্রধানের বরাত দিয়ে ক্রীড়া দৈনিক ইএসপিএন তাদের এক বিশেষ ফিচারে ESPN Football Feature জানিয়েছে, নেইমারের বর্তমান কন্ডিশন ম্যাচ খেলার উপযোগী হলেও তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে তাকে হয়তো পুরো ৯০ মিনিট খেলানো হবে না, বরং একজন ‘ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট’ বা ‘সুপার সাব’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। আনচেলত্তির মূল পরিকল্পনা হলো ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং রাফিনহার মতো গতিশীল উইঙ্গারদের পেছনে নেইমারকে ‘নাম্বার টেন’ বা প্লে-মেকার পজিশনে খেলানো, যাতে তিনি ড্রিবলিংয়ের চেয়ে ফাইনাল পাস ও সেট-পিস তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।
কার্লো আনচেলত্তির স্কোয়াড নির্বাচন ও ট্যাকটিক্যাল প্ল্যান কেমন হতে পারে?
কার্লো আনচেলত্তির ঘোষিত ২৬ সদস্যের এই স্কোয়াডে স্পষ্টতই অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক দারুণ মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে। আক্রমণভাগে রিয়াল মাদ্রিদের মহাতারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়র (Vinicius Junior) এবং বার্সেলোনার ইন-ফর্ম উইঙ্গার রাফিনহা (Raphinha) নিশ্চিতভাবেই মূল একাদশের দায়িত্ব সামলাবেন। তাদের সাথে লিওঁ-তে খেলা তরুণ স্ট্রাইকার এন্ড্রিক এবং আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি দলের আক্রমণকে বহুমাত্রিক করে তুলবেন। আনচেলত্তি মূলত একটি ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দলকে খেলাতে অভ্যস্ত, যেখানে নেইমারকে মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগের সংযোগকারী সেতু হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
তবে মাঠের কৌশল যাই হোক না কেন, রদ্রিগো এবং এস্তেভাওয়ের মতো দুই গতিশীল ও প্রেস-রেজিস্ট্যান্ট ফরোয়ার্ডকে মিস করা ব্রাজিলের জন্য বড় খেসারত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার তীব্র গরম ও বিশাল দূরত্বের ভেন্যুগুলোতে যেখানে উচ্চ-শক্তির কাউন্টার-প্রেসিং প্রয়োজন, সেখানে মাঝমাঠে কাসেমিরো এবং ব্রুনো গিমারায়েসের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যাবে। আনচেলত্তি ডিফেন্সে মার্কুইনহোস এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালাহিসের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখলেও, আক্রমণভাগে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি পুরো দলের ট্যাকটিক্যাল ব্যালেন্সকে কিছুটা আক্রমণাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, যা টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
FAQ:
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ব্রাজিলের চূড়ান্ত স্কোয়াড কত সদস্যের?
কোচ কার্লো আনচেলত্তি উত্তর আমেরিকা (ইউএসএ, কানাডা ও মেক্সিকো) বিশ্বকাপের জন্য মোট ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন।
নেইমার কতদিন পর ব্রাজিল জাতীয় দলে ফিরলেন?
২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল ইনজুরিতে পড়ার পর এটিই ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের প্রথম প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ আড়াই বছর পর তিনি দলে ডাক পেলেন।
ব্রাজিলের প্রধান কোন কোন খেলোয়াড় ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ মিস করছেন?
ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম দুই প্রধান স্তম্ভ রিয়াল মাদ্রিদের রদ্রিগো (Rodrygo) এবং তরুণ উইঙ্গার এস্তেভাও (Estevao) মারাত্মক চোটের কারণে এই বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ছিটকে গেছেন।
বর্তমানে নেইমার কোন ক্লাবের হয়ে খেলছেন?
ইনজুরি কাটিয়ে ওঠার পর নেইমার জুনিয়র বর্তমানে তাঁর শৈশবের ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের (Santos) হয়ে খেলছেন।
ব্রাজিল স্কোয়াডে গোলরক্ষক পজিশনে কারা সুযোগ পেয়েছেন?
গোলরক্ষক হিসেবে দলে ডাক পেয়েছেন লিভারপুলের অ্যালিসন (Alisson), ফেনারবাখের এদেরসন (Ederson) এবং গ্রেমিওর প্রবীণ গোলরক্ষক ওয়েভারটন (Weverton)।
আনচেলত্তির অধীনে নেইমার এর আগে কতটি ম্যাচ খেলেছেন?
মে ২০২৫-এ কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেইমার ইনজুরিতে থাকায় মে ২০১৬-র এই স্কোয়াড ঘোষণার আগে তাঁর অধীনে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার:
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কেবল ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপা বা ‘হেক্সা’ জয়ের মিশনই নয়, এটি মূলত নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ এবং সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। কার্লো আনচেলত্তির এই ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, আধুনিক ফুটবলে কেবল গতি আর ট্যাকটিক্সই শেষ কথা নয়; বড় টুর্নামেন্ট জিততে হলে মাঠের ভেতর একজন জাদুকরের প্রয়োজন হয়, যিনি এক মূহূর্তের পায়ে জাদুতে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। পেলেকে ছাড়িয়ে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসা নেইমারের ট্রফি ক্যাবিনেটে কেবল একটি বিশ্বকাপেরই কমতি রয়েছে। দীর্ঘ ইনজুরির ধাক্কা, বয়স এবং ফর্মের তীব্র সমালোচনাকে পেছনে ফেলে সান্তোসের এই রাজপুত্র যদি উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজের চেনা ছন্দের সামান্যতম ঝলকও দেখাতে পারেন, তবে আনচেলত্তির এই জুয়া ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে গণ্য হবে। এখন দেখার বিষয়, ভিনিসিয়াস, রাফিনহা এবং এন্ড্রিকের মতো তরুণ তুর্কিদের সাথে নিয়ে নেইমার ব্রাজিলকে তাদের বহুকাঙ্ক্ষিত বিশ্বসেরার মুকুট এনে দিতে পারেন নাকি ইনজুরির কালো ছায়া আবারও তাঁর মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়কে ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়। পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে সেলেসাওদের এই ঐতিহাসিক অভিযানের দিকে।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News



